বাংলাদেশ

তিন কারণে বাড়ছে চালের দাম

চলতি মৌসুমে ধানের ফলন ভালো হয়েছে। চালের পর্যাপ্ত সরবরাহও রয়েছে। তবু, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাড়ছে চালের দাম। হঠাৎ করে চালের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে তিনটি কারণকে দায়ী করেছেন অর্থনীতিবিদ ও বাজার-সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, চাল রপ্তানির অনুমোদন, মিলমালিক ও পেঁয়াজের দাম বাড়ার ছায়াপ্রভাব।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা চাল ৩৫ টাকার স্থলে ৩৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া, বেড়েছে মিনিকেট চালের দামও। ৫২ টাকার কেজি দরের চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকায়।

রাজধানীর কয়েকটি চালের আড়তে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের শুরু থেকেই চালের দাম বাড়ছে। জানুয়ারিতে পেঁয়াজের দাম নিয়ে চারদিকে শোরগোল থাকায় চালের মূল্যবৃদ্ধি জনসাধারণের নজরে পড়েনি। তবে কয়েকদিনের চালের মূল্যবৃদ্ধি দৃশ্যত হচ্ছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে একটি অদৃশ্য হাতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এই অদৃশ্য হাত একদিকে যেমন সরকারের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে, তেমনি এর কারণ অনুসন্ধানও সাধারণ মানুষের জানার বাইরে থাকে। এই ‘অদৃশ্য হাতের’ অসাধু চক্রের কব্জায় থাকে দেশের নিত্যপণ্যের বাজার। কয়েক মাস ছিল পেঁয়াজে, এখন চালে পড়েছে এর প্রভাব।

এক সময় অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে আমদানি করতে হতো। তবে গত কয়েকবছর ধরে দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় আর আমদানি করতে হচ্ছে না। চাল রপ্তানিকে উৎসাহিত করতে চলতি বছর প্রথমবারের মতো ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত রপ্তানি করা চালের দামের বিপরীতে ১৫ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়া, অভ্যন্তরীণ বাজারে চালের দাম কমে যাওয়ায় কৃষক পর্যায়ে ধানের দাম নিশ্চিত করতে গত বছরের জুলাইয়ে ২ লাখ টন সিদ্ধ চাল রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সে অনুযায়ী ব্যবসায়ীদের রপ্তানির অনুমোদনও দিয়ে আসছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এমন একটি সময়ে এই ভর্তুকির সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, যখন অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় মোটা চাল রপ্তানি বন্ধ রাখে মন্ত্রণালয়। সব মিলিয়ে চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়াকে এই খাদ‌্যপণ‌্যটির মূল্যবৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।

অভিযোগ রয়েছে, বাজার মনিটরিংয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকার সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ী ও মিলমালিকরা। সরকারি নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা যেমন দফায় দফায় পণ্যের দাম বাডায়, এবার এর আঁচড় পড়েছে চালে। এক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ীদের তুলনায় মিলমালিকদের বেশি দায়ী করছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, গত বছরের অক্টোবর থেকেই চালের দাম বাড়ছে। কিন্তু পেঁয়াজের অস্বাভাবিক দাম বাড়ায় পরিস্থিতি অস্বাভাবিক ছিল। ফলে চালের দাম বাড়ার বিষয়টি খুব বেশি নজরে আসেনি। অক্টোবরে মাসে কোনোভাবেই চালের দাম বাড়ার কথা নয়। তখন আড়তদার, মিল মালিক কিংবা খুচরো বিক্রেতা—সবাই একবাক্যে বলছিলেন, এ সময়ে এভাবে চালের দাম বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই।

নভেম্বরের শুরুতে সংবাদ সম্মেলন করে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছিলেন, ‘দেশে চালের পর্যাপ্ত মজুত আছে। সরবরাহেও কোনো ঘাটতি নেই।’ তবে, পেঁয়াজের কারণে চালের ওই দাম বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, তখন আলোচনা চলছিল যে, ‌‘এবার সবাই ধান চাষ না করে পেঁয়াজ চাষ করবে, আর চালের দাম বাড়বে। ’ কয়েকজন চাল ব্যবসায়ী এই কারণটিকে যৌক্তিক বলেও মনে করেন।

এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের চাল ব্যবসায়ী ফরিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা যে পর্যায়ে ব্যবসা করি, তাতে দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমরা যে রেটে চাল আনি, সে হিসেবে পাইকারি ও খুচরায় রেট ধরতে হয়। ’ তিনি বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মিলমালিকরাই কিছুটা বাড়তি দাম বলছেন। আমাদের কিছু করার থাকছে না।’

মিলমালিকরা তো কারণ ছাড়া দাম বাড়াতে পারে না, তাহলে তারা কেন বাড়াতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে ফরিদ হোসেন বলেন, ‘সরকার রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছেন, ভর্তুকিও দিচ্ছেন, কিন্তু মনিটরিং তো হচ্ছে না। এর ফায়দা নিচ্ছে একটি শ্রেণি।’

এসব অভিযোগের জবাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. ওবায়দুল আজম বলেন, ‘চালের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টিতে নজর রাখছে মন্ত্রণালয়। ’ সংশ্লিষ্ট পক্ষদের নিয়ে করণীয় নির্ধারণে বৈঠক হবে বলেও তিনি জানান।

সূত্রঃ রাইজিংবিডি

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button

Blocker Detected

Please Remove your browser ads blocker