আন্তর্জাতিক

করোনায় কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বাংলাদেশের চাকরিজীবীরা?

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) একটি প্রতিবেদনে বলছে, করোনা মহামারির কারণে এই বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এসে আগামী তিন মাসের মধ্যে সাড়ে ১৯ কোটি মানুষ তাদের পূর্ণকালীন চাকরি হারাতে যাচ্ছে। এতে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোয় চাকরি হারাতে যাচ্ছে সাড়ে ১২ কোটি মানুষ। বর্তমানে বিশ্বের পূর্ণ বা খণ্ডকালীন মোট কর্মশক্তির প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজনের পেশা কোন না কোনভাবে কোভিড-১৯ এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমেরিকার দেশগুলোয় চাকরি হারাবে দুই কোটি ৪০ লাখ কর্মী, ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় দুই কোটি (ইউরোপে এক কোটি ২০ লাখ), আরব দেশগুলোয় প্রায় ৫০ লাখ ও আফ্রিকায় এক কোটি ৯০ লাখ কর্মী।

আইএলও বলছে, বিভিন্ন আয়ের মানুষজন এর ফলে ক্ষতির শিকার হবে। কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণী। আবাসন ও খাদ্যের পাশাপাশি নির্মাণ, খুচরা বিক্রি, ব্যবসা এবং প্রশাসনিক খাতগুলো বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে।

আইএলও মহাপরিচালক গাই রেইডার বলেছেন, উন্নত ও উন্নয়নশীল, সব দেশের ব্যবসা ও কর্মশক্তি চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। আমাদের যৌথভাবে, সুপরিকল্পিতভাবে এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। এখন সঠিক আর দ্রুত ভিত্তিতে নেওয়া পদক্ষেপই টিকে থাকা আর ভেঙ্গে পড়ার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করতে পারে।”

পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলছেন, বাংলাদেশ থেকে যে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়, তার ৬৩ শতাংশ ইউরোপে যায়, বাকি ১৫ শতাংশ যায় আমেরিকায়। বলা যায়, বেশিরভাগ যাচ্ছে, ওই দুইটি বাজারে। সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ, মানুষজন ঘরের ভেতরে। করোনাভাইরাসের প্রভাব শুরু হওয়ার পর এখন ৩.২ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিল হচ্ছে। তারা বলছে, হোল্ড করতে, সেটা একটা বিরাট ধাক্কা। গত বছরের মার্চ মাসের তুলনায় এবছর মার্চ মাসে রপ্তানি হয়েছে ৩০ শতাংশ কম। এপ্রিলে সম্ভাবনা রয়েছে, গত বছরের তুলনায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি হারানো। আর এর সাথে ৪৫ লাখ চাকরি জড়িত।

ড. আহসান এইচ মনসুর বলছেন, সরকারের মাধ্যমে তারা হয়তো আগামী তিনমাস সুরক্ষা পাবেন। জুন মাস পর্যন্ত। কিন্তু এটা সাময়িক একটা ব্যবস্থা। এরপরে কী হবে? ব্যবসা করতে না পারলে কোম্পানিগুলো কর্মী রাখবে কেমন করে? এর বাইরে অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। সেই সঙ্গে বড় একটি ধাক্কা হতে যাচ্ছে রেমিটেন্সে। সেখানে একটা বিরাট ধ্বস নেমেছে।

করোনায় কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বাংলাদেশের চাকরিজীবীরা?

বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র বলেছে, শতাধিক কারখানায় কর্মী ছাটাই করা হয়েছে।

করোনা ভাইরাস জনিত পরিস্থিতিতে ২৬শে মার্চ থেকে বাংলাদেশে যে অঘোষিত লকডাউন শুরু হয়েছে, এর ফলে যারা হোটেল-রেস্তোরা, নির্মাণ খাতের মতো অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, সেসব খাতে শ্রমিকরা দীর্ঘদিন বেকার বসে রয়েছেন। অনেকেই বেতন ভাতা পাচ্ছেন না। আর্থিক কারণে এরকম কোন প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে তখন সেটির শ্রমিকরা সেখান থেকে কোন আর্থিক সুবিধা পান না।

কর্মসংস্থানের ওপর করোনা ভাইরাসের প্রভাবের বিষয়টি একেক দেশের শ্রমবাজারে একেকভাবে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষক পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

তিনি বলছেন, ‘বাংলাদেশের জন্য দুইটি ভিন্ন প্রেক্ষিত রয়েছে। আইনগতভাবে আনুষ্ঠানিক সেক্টরে শ্রমিককে ছাটাই করতে হলে তার পাওনা-ভাতা দিয়ে বিদায় করতে হয়। কিন্তু সেটা করার মতো মানসিক বা আর্থিক ক্ষমতা অনেক উদ্যোক্তার নেই।তাই তারা চাইবেন বিকল্পভাবে ছুটি বা শ্রমিকের ভাতা কিছু কম দিয়ে সময়টা দীর্ঘায়িত করার। সেরকম কয়েকটি ঘটনাও সম্প্রতি আমরা দেখেছি।’

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা কাজ হারাতে পারেন। এরপরেও খুচরা ব্যবসায়ের সাথে জড়িত শ্রমিকরা কাজ হারাবেন। তবে খাতভিত্তিক চিন্তা করলে হোটেল রেস্তোরা, সেবা খাতের কর্মীরা বেশি কাজ হারাতে পারেন।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) এর কর্মকর্তা নাজমা ইয়াসমিন জানিয়েছেন, ‘কোন জরিপ ছাড়াই আমরা দেখতে পাচ্ছি, অনানুষ্ঠানিক খাতে যারা কাজ করেন, করোনা ভাইরাসের এই পরিস্থিতিতে তারা এর মধ্যেই বসে গেছেন। ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন পার্লার, দোকান, ইত্যাদি বন্ধ হয়ে আছে। সেখানে একজন দুইজন করে যারা কাজ করেন, তাদের চাকরিও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে।’

বিলসের মতে, বেশ কয়েকটি সেক্টর বিশেষভাবে ঝুঁকিতে পড়বে। তার মধ্যে হোটেল, রেস্তোঁরা, নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে পড়বে। তবে বাংলাদেশের কতো শ্রমিক এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সেই হিসাব এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি বাংলাদেশের গবেষণা সংস্থাগুলো।

সোমবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক ঘোষণায় জানিয়েছেন, দিনমজুর, রিক্সা বা ভ্যান চালক, মটর শ্রমিক ও নির্মাণ শ্রমিক, পত্রিকার হকার, হোটেল শ্রমিকসহ অন্যান্য পেশার মানুষ যারা দীর্ঘ ছুটি বা আংশিক লকডাউনের ফলে কাজ হারিয়েছেন, তাদের নামের তালিকা ব্যাংক হিসাবসহ দ্রুত তৈরির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাদের সহায়তার জন্য ৭৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সূত্র: বিবিসি।

সূত্রঃ ইত্তেফাক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button

Blocker Detected

Please Remove your browser ads blocker