বাংলাদেশ

টমেটো আর ‘গলার কাঁটা’ নয়

শীতের সকালে গোদাগাড়ীর একটি ক্ষেতে টমেটো তুলছিলেন মুন্নাসহ পাঁচজন চাষি। প্রতিদিন তাঁরা ৪০০ কেজি টমেটো তোলেন এই ক্ষেত থেকে। রাজশাহীতে কয়েক বছর আগেও ভরা মৌসুমে এই পরিমাণ টমেটো তুললে তাঁদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াত সঠিক দামে বিক্রি। মৌসুমের মাঝামাঝিতে টমেটোর দাম স্থানীয় বাজারে উৎপাদন খরচের অনেক নিচে নেমে যেত। ফলে অনেক টমেটোই গোখাদ্যে পরিণত হতো। তবে এখন আর সেই দুশ্চিন্তা নেই। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান ‘প্রাণ’ সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে টমেটো সংগ্রহ করছে। এসব টমেটো নিয়ে স্থানীয় কারখানায় সস ও কেচাপ তৈরির কাঁচামাল তৈরি করে নিজেদের বিভিন্ন কারখানায় সরবরাহ করছে তারা।

এ জন্য স্থানীয় চাষিদের সঙ্গে চুক্তিও করেছে কম্পানিটি। চাষিদের জন্য লাভজনক হওয়ায় দিন দিন চুক্তিভিত্তিক চাষির সংখ্যাও বাড়ছে তাদের। ফলে তারা নিজেদের কারখানার বাইরেও সস তৈরির কাঁচামাল বিক্রির পরিকল্পনা করছে বলে জানা যায়।

মাচায় টমেটোর একটি গাছ বাঁধতে বাঁধতে কৃষক ইফতেখার আহমেদ মুন্না কালের কণ্ঠকে জানালেন, একটা সময় আমরা বাজার থেকে বীজ কিনে টমেটো চাষ করতাম। এগুলো উন্নত জাতের ছিল না এবং গাছগুলো মাটির ওপর পড়ে থাকত। এতে ফলন কম হতো, টমেটো নষ্টও হতো বেশি। প্রাণ এখানে কারখানা করার পর আমাদের প্রশিক্ষণ ও উন্নত জাতের বীজ দিয়েছে। এখন মাচা পদ্ধতিতে চাষ করছি। ফলে টমেটো নষ্ট হচ্ছে না এবং উৎপাদনও বেড়েছে।

তবে তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো টমেটো কেনার চুক্তি। তিনি জানান, তাঁরা আমাদের কাছ থেকে বাজার মূল্যে টমেটো কেনার চুক্তি করেছেন। এতে এখন আর টমেটো বিক্রি না হওয়ার দুশ্চিন্তা নেই। তাঁরা সুনির্দিষ্ট নিয়মে ও পরিমাণে প্রতিদিন আমাদের টমেটোগুলো কিনে নেন। পুরো মৌসুমেই তাঁদের কাছে টমেটো বিক্রি করতে পারি।

একই কথা বলেন, শাহাদাত নামের আরেকজন কৃষক। তিনি বলেন, ‘যেকোনো পণ্যের বড় ক্রেতা থাকলে স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ে। এতে দাম ভালো পাওয়া যায়। টমেটো এখন আমাদের লাভজনক ফসল। তাই অনেকে টমেটো চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। আমরা ছয়জন মিলে জমি লিজ নিয়ে এখানে ৫০ বিঘায় টমেটো চাষ করছি।’

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ সুবিধার অভাবে প্রতিবছর ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ফল ও সবজি নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে কৃষক তাঁর পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বাংলাদেশে বহুল উৎপাদিত কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এমন একটি ফসল হলো টমেটো।

জানা যায়, দেশের বৃহৎ কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণ গ্রুপ ২০০২ সাল থেকে টমেটো থেকে নানা ধরনের খাদ্যপণ্য প্রস্তুত করে আসছে। ২০১০ সালে প্রাণ টমেটোর চুক্তিভিত্তিক চাষ শুরু করে।

জানা যায়, আম ও টমেটোর রাজ্য রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে কাঁচামালের সহজলভ্যতার চিন্তা থেকেই বরেন্দ্র ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক-বিআইপি নামে নতুন কারখানা করে প্রাণ গ্রুপ। কারখানায় টমেটোকে প্রক্রিয়াজাত করে পাল্পিং করা হয়। এসব পাল্পকে আরো ঘন করে ‘এসেপটিক ফিলিং’ ব্যাগে সংরক্ষণ করে সস ও কেচাপ তৈরির জন্য নাটোরসহ বিভিন্ন কারখানায় পাঠানো হয়। টমেটো ছাড়াও মৌসুমে আম ও পেয়ারা পাল্পিং করা হয় এই কারখানায়।

সম্প্রতি কারখানায় গিয়ে কথা হয় বিআইপির উপমহাব্যবস্থাপক সৈয়দ মো. সারওয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘যেসব কৃষক আমাদের চুক্তির আওতায় এসেছেন আমরা মূলত তাঁদের কাছ থেকেই টমেটো নিয়ে সস তৈরি করি। কারণ চুক্তির অধীনে এলে বিষমুক্ত ও গুণগত মানের সবজি উৎপাদনে চাষিদের বেশ কিছু কমপ্লায়েন্স মানতে হয়। এর বিনিময়ে আমরা তাঁদের উৎপাদিত সবজি বাজারদর অনুযায়ী কিনে নেওয়ার নিশ্চয়তা দিই। এ ছাড়া সময় সময় ভালোমানের বীজ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে তাঁরা আধুনিক চাষাবাদ করতে পারেন।’

কারখানায় ঘুরে দেখা যায়, প্লাস্টিকের ক্যারেট ভর্তি টমেটোগুলো ফিডিং কনভেয়ারে ঠাণ্ডা ও গরম পানি দিয়ে দুই দফায় পরিষ্কার করা হচ্ছে। তারপর টমেটো স্বয়ংক্রিয় কনভেয়ারে চলে যাচ্ছে চূড়ান্ত বাছাইয়ে। সেখানে একদল কর্মী নিম্নমানের ও নষ্ট কোনো টমেটো থাকলে সরিয়ে নিচ্ছেন দ্রুত হাতে। এরপর তা ডিসট্রনার মেশিনে প্রক্রিয়াজাত করে রিফাইন হয়ে তৈরি হচ্ছে টমেটোর লিকুইড পাল্প। সেগুলোকে আরো কনসেন্ট্রেড করে এয়ারটাইড এসেপটিক ব্যাগে ভরা হচ্ছে। এসব প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণটাই হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় মেশিনে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাণের প্রায় এক লাখ চুক্তিভিত্তিক কৃষক রয়েছেন। নাটোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা এবং দিনাজপুর জেলায় প্রাণের চুক্তিভিত্তিক কৃষকরা টমেটো উৎপাদন করে থাকেন। এই বছর প্রায় ১০ হাজার কৃষক ৮৬৭ বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছেন। চলতি বছর টমেটো সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ১২ হাজার টন। ২০১৯-২০ সালে আট হাজার ৪০০ কৃষকের কাছ থেকে সাত হাজার টন টমেটো সংগ্রহ করা হয়েছিল। ২০১৮-১৯ সালে সাত হাজার ৫০০ চাষি দিয়েছিলেন প্রায় ছয় হাজার টন। প্রতিবছর প্রাণের চুক্তিভিত্তিক কৃষক বেড়েছে গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ হারে।

কর্মকর্তারা বলছেন, উপযুক্ত সময়ে চুক্তিভিত্তিক কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে টমেটো সংগ্রহ এবং অধিক ফলনের জন্য প্রাণের পক্ষ থেকে কৃষকদের সহায়তাই এর মূল কারণ।

আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সহযোগিতায় ‘প্রাণ অ্যাসিউরড স্কিমের আওতায়’ প্রাণ দুই হাজার চুক্তিভিত্তিক টমেটো চাষিকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করেছে।

প্রাণের চুক্তিভিত্তিক চাষিরা বিঘাপ্রতি গড়ে ১০ টন অর্থাৎ ২৫০ মণ পর্যন্ত টমেটোর ফলন পেয়ে থাকেন। এসব টমেটো তাঁরা চলমান বাজারমূল্যে কয়েক ধাপে বিক্রি করেন। এতে বিঘাপ্রতি তাঁদের টমেটো বিক্রি হয় এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা দরে। অন্যদিকে তাঁদের খরচ বিঘাপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। এতে তাঁদের বিঘাপ্রতি মুনাফা আসে অন্তত ৫০ হাজার টাকা। গোদাগাড়ী ছাড়াও রাজশাহী সদর ও পদ্মার চরে টমেটো চাষ বেশি হচ্ছে।

গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি অফিসার শফিকুল ইসলাম বলেন, এই অঞ্চলের মাটি উঁচু-নিচু এবং উর্বর। ফলে সব ধরনের ফসলই উৎপাদন ভালো হয়। আগে ধান বেশি হতো। কিন্তু কৃষক দীর্ঘদিন লোকসানে থাকায় এখন হর্টিকালচারাল ক্রমসে আগ্রহী হয়ে উঠছে। রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে প্রতিবছর গড়ে দুই হাজার ৫০০ হেক্টরের বেশি জমিতে টমেটোর চাষ হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আম চাষের পরপরই ওই এলাকায় এখন বেশি হচ্ছে টমেটোর চাষ।

সূত্রঃ কালের কণ্ঠ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button

Blocker Detected

Please Remove your browser ads blocker