বিনোদন

‘‘আপনি ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ বলছেন, তাহলে প্রথম ও দ্বিতীয় লিঙ্গ কে?’’

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এর ঠিক দুদিন আগে থেকেই আলোচিত হচ্ছে তাসনুভা আনান শিশিরের নাম। দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনে তিনি রূপান্তরিত নারী (ট্রান্সজেন্ডার) হিসেবে প্রথম সংবাদ পাঠ করবেন। শৈশবের কামাল হোসেন শিশির থেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নিজেকে তাসনুভা আনানে রূপান্তরিত করে তিনি নজিরবিহীন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর এই সাহসী পথচলা এখন অনেকেরই অনুপ্রেরণা। কিন্তু তিনি কীভাবে অনুপ্রাণিত হলেন? সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কীভাবে বদলে গেল তার জীবনযাপন? জানতে তাসনুভা আনানের সঙ্গে কথা বলেছেন রাইজিংবিডির জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রাহাত সাইফুল।

রাহাত সাইফুল: অভিনন্দন। আপনার নতুন আরেকটি পরিচয় হতে যাচ্ছে- সংবাদ পাঠিকা। কীভাবে এটি সম্ভব হলো?

তাসনুভা: আমি মূলত থিয়েটারকর্মী। থিয়েটার আমার অনুপ্রেরণা। ২০০৭ থেকে আমি থিয়েটারে কাজ করি। এখন কাজ করছি ‘বটতলা’য়। নাট্যনির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী দিদির মাধ্যমে বৈশাখী টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। আমরা একটি অনুষ্ঠান নিয়ে কথা বলছিলাম। সেখানে দিদির পরিচালনায় আমার পারফর্ম করার কথা ছিল। তো মিটিংয়ের জন্য বৈশাখী টেলিভিশনের অফিসে যাই। সেখান থেকেই অন্যদের সঙ্গে পরিচয়। তখন তারা আমাকে বলে সংবাদ পাঠিকার বিষয়ে। কিন্তু এটি সহজ ছিল না। আমি প্রথমে অডিশন দেই। এরপরই মূলত কাজটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাই।

রাহাত সাইফুল: রূপান্তরিত নারী হিসেবে অন্যরা আপনাকে দেখে এখন উৎসাহিত হবে। আপনার কী মনে হয়?

তাসনুভা: প্রত্যেক মানুষ আসলে আলাদা। আমি নিউজ পড়তে এসেছি বলে সবাই নিউজ পড়বেন এমন নয়। যার যে কাজ করতে ইচ্ছে হবে তিনি সেই কাজ করবেন। প্রত্যেকে তার যোগ্যতায় সমাজে জায়গা করে নেবে। জেন্ডার আইডেন্টিটি ব্যক্তির একান্ত পরিচয়। আপনি যখন আমাকে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ বলছেন তাহলে প্রথম ও দ্বিতীয় লিঙ্গ কে? আপনি যখন আমাকে ক্যাটাগোরাইজ করছেন তখন আপনি আমাকে আরেকবার হ্যারাজমেন্ট করছেন। অর্থাৎ আরেকবার কাপড় খোলার মতো অপমান করছেন। আমরা তো নারী পুরুষের বাইরে অন্য কিছু ভাবতেই পারছি না। ‘পুরুষের মতো’, ‘নারীর মতো’ এই যে শব্দের ব্যবহার- এটা ওই মানুষটির জন্য কতটা পজিটিভ বা নেগেটিভ কেউ কি কখনও ভেবেছেন? স্কুল, পরিবার ও ফ্রেন্ড সার্কেল খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গাগুলোতে সাপোর্ট পেলে সামনে চলতে সহজ হয় বলে আমি মনে করি।

রাহাত সাইফুল: আপনি যে সাপোর্টের কথা বললেন; আপনি কতটা পেয়েছেন?

তাসনুভা: আমার বাড়ি বাগেরহাট। আমার পরিবার আমাকে স্কুল পর্যন্ত দেখেছে। এরপর আস্তে আস্তে দূরে চলে যাই। একটা সময় নারায়ণগঞ্জ ছিলাম। আমার স্কুলে ভালো পজিটিভ কোনো স্মৃতি নেই। আমার কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ও তেমনই। আমাকে ছুটতে হয়েছে প্রচণ্ড! নেগেটিভ, খারাপ পরিবেশ সঙ্গে নিয়েই আমাকে তৈরি হতে হয়েছে। সরকারি তোলারাম কলেজে সমাজকর্মে অনার্স, মাস্টার্স করেছি। এখন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিক হেলথে পড়ছি।

রাহাত সাইফুল: আপনার নতুন জার্নি- বিষয়টি আপনার পরিবারের লোকজন এখন অবশ্যই জেনেছেন। তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন?

তাসনুভা: হয়তো তারা পজিটিভ। ভাইয়ার সঙ্গে, আপুদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা খুশি।

রাহাত সাইফুল: আপনার কথায় মনে হচ্ছে কোথাও এখনও অলক্ষ্যে অভিমান বা ঘাটতি রয়ে গেছে।

তাসনুভা: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) আসলে কি, আমার জায়গাটা এত ফাঁকা, এত ব্যবধান- সত্যি কথা বলতে ওই অনুভূতিটা কেমন আমি জানি না। কিন্ত তারা পজিটিভ। প্রায় সাত-আট বছর বাড়িতে আমার যাওয়া হয় না। কথা হয় অবশ্য। এর মধ্যে মায়ের সঙ্গে জাস্ট দু’বার দেখা হয়ছে।

রাহাত সাইফুল: এখন যাবেন?

তাসনুভা: একটা পরিচয়ের অপেক্ষায় ছিলাম। আমাকে ‘হিজড়া’ বা ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ কোড, আনকোড আমি পছন্দ করি না। এই শব্দ নিয়ে আমি বাড়ি যেতে চাইনি। সারা জীবন একটা কথা শুনেছি। আমি তাদের বাড়ির মানসন্মান নষ্ট করেছি। আমার কারণে তাদের অপমানিত হতে হয়। তাদের মানসন্মান যাতে না যায় সে জন্য আমি বাড়ি যাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছি। বাড়ি ফিরব কিনা সিদ্ধান্ত এখনও নেইনি। যদি ফিরি তাহলে অবশ্যই সেই সন্মান নিয়ে ফিরব।

রাহাত সাইফুল: জানি প্রচণ্ড ব্যস্ততায় এখন আপনার দিন কাটছে। আপনি এই সাফল্য উদযাপন করুন। আমার শেষ প্রশ্ন- আপনার কমিউনিটির জন্য কী বলতে চান?

তাসনুভা: আমার কমিউনিটির জন্য পরামর্শ হলো- যোগ্য হওয়াটা খুব জরুরি। নিজ নিজ জায়গায় যোগ্য হতে হবে। অন্তত চেষ্টাটা করতে হবে। পড়াশোনা করাটা আরো জরুরি।

সূত্রঃ রাইজিংবিডি.কম

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button

Blocker Detected

Please Remove your browser ads blocker