বাংলাদেশ

বাড়ির আঙ্গিনায় ঔষধি গাছ, করোনাকালে বিপদের বন্ধু

মানবকল্যাণে ‘কার্ডিওলজি’ বাগানঃ

বাড়ির আঙ্গিনায় প্রকৃতির ‘কার্ডিওলজি’ বিভাগ বানিয়েছেন তিনি। বিশ্বাস করেন তিনিই প্রকৃত ধনী, যার শোবার ঘর থেকে বাগান বড়। তিনি তাই করেছেন। কোভিড-১৯ কালে তার বাগানের ঔষধি গাছের চারা নিকটজন পরিচিতজন বন্ধুবান্ধবের কাছে পৌঁছে দেন। পরিচর্যা রোপণ প্রক্রিয়া জানিয়ে দেন। কোন দাম নেন না। মানবকল্যাণের ব্রত পালন করছেন। বললেন, এই সামান্য সহযোগিতায় কেউ উপকৃত হলে তিনি খুশি। বিশে^র এই অতিমারীতে (প্যানডেমিক) যে যার অবস্থান থেকে সহযোগিতার হাত বাড়ানো দরকার। তিনি তার সাধ্যের মধ্যে এমনটি করছেন।

তার নাম আসাফ-উদ-দৌলা ডিউক। বাড়ি বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া এলাকায়। ১৯৮২ সালে বগুড়া জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হন। ১৯৮৯ সালে বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগে ডিপ্লোমা পাস করেন। ছেলেবেলা থেকেই বাগানের প্রতি প্রচ- ঝোঁক। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া চার শতাংশ জমিতে টিনের চালার পাকা বাড়ির আঙ্গিনায় বাগান করেছেন। বৃক্ষপ্রেমী ডিউক আঙ্গিনার ঔষধি ও ফল ফলাদির গাছ লাগিয়েছেন। তার মধ্যে আছে তুলসি, থানকুনি, ঝিঁঝিঁ, পুদিনা, গায়নুড়া, পাথরকুচি, গন্ধভাজনসহ নানা জাতের গাছ আছে। ফলের মধ্যে আম্রুপালি ও বারোমাসি আম, লিচু, তিন জাতের পেয়ারা। ফুলের মধ্যে মে-ফ্লাওয়ার, রজনীগন্ধা গোলাপ নাইন ও ক্লক কিছু বনফুল। যার নাম আবিষ্কার করতে পারেননি। তুলসি পাতাকে মনে করেন ঔষধি মাস্টার।

দেশে পেঁয়াজ নিয়ে যখন তোলপাড় তখন সয়াবিনের পাঁচ লিটারের বোতল কেটে টব বানিয়ে মাটি ভরে পেঁয়াজের গোড়ার অংশ ঠিক রেখে তিনভাগ করে কেটে রান্নার কাজে লাগিয়েছেন। একটি অংশে মাটিতে বুনেছেন। প্রতিটি টবে ১০/১২টি করে পেঁয়াজ পেয়েছেন। বললেন প্রতিদিন সকালে খালিপেটে দুইটি করে গায়নুড়া গাছের পাতা চিবিয়ে খেলে ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে আসে। দিনে একটি করে পাথরকুচি পাতা ইউরোসাইড (মূত্রনালী) পরিষ্কার থাকে। এ ছাড়াও রক্ত পরিষ্কার সহ শরীরের নানা উপকার করে। ঝিঁঝিঁ পাতা খাওয়ার সময় একটু কম্পন অনুভূত হলে ভয়ের কিছু নেই। দাঁত মজবুতে এই পাতার বিশেষ গুণাগুণ আছে। থানকুনি পাতার গুণাগুণ তো বলে শেষ করা যাবে না। শরীরের রোগব্যাধি দূর করতে এবং স্কিনের জেল্লা এনে বয়স ধরে রাখতে এই পাতার জুড়ি নেই।

ডিউকের এই বাগানের খবর অনেকেই জানে না। নীরবে নিভৃতে থাকেন তিনি। যন্ত্র প্রকৌশলী হওয়ার পর নিজেকে কোন এক সময়ে মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ভাল আলোকচিত্রী হিসাবে শিল্পকলা একাডেমির সম্মাননা পেয়েছেন। মানুষ হিসাবে নিজেকে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কোভিড-১৯ কালে তিনি পরিচিতজন বন্ধুবান্ধবের কাছে গাছের চারা পৌঁছে দিয়েছেন নিজের গরজে। বলেছেন এই কঠিন সময়ে যতটুকু পাড়া যায় এই গাছের পাতা রোগমুক্তিতে সহায়ক হবে। চেনা পরিচিত কেউ অসুখবিসুখে পড়লে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ান।

এক পর্যায়ে বললেন, বাগানে বসে থাকলে মনে হয় গাছেরা তার সঙ্গে কথা বলছে। তিনি গাছের কথা বুঝতে পারেন। সন্তান হিসেবে গাছকে লালন করেন। বললেন,তার ঘরের সামনের এই বাগানকে কার্ডিওলজি বিভাগ মনে করেন। কারণ বাগানের মাটি, প্রকৃতির গাছগাছালিরও বাতাস এতটাই পরিষ্কার যে শ্বাস প্রশ্বাসে প্রাণ খুঁজে পাওয়া যায়। বাগানে বসে শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যায়াম (ব্রেদিং এক্সারসাইজ) করলে শরীর ফ্রেস হয়ে আসে। প্রতিদিন তিনি তার স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে এই বাগানে সকালে ও সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ বসেন। সকালের রোদের ভিটামিন ডি-৩ এবং মাটিতে খালি পায়ের স্পর্শ থাকলে অর্থোপেডিকের উপকার হয়।

ডিউক ঘর গৃহস্থালির তরকারির ছাল বাকল, মাছের আঁশ ও উচ্ছিষ্ট এগুলো আঙ্গিনার মধ্যে বিভিন্ন স্থানে মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখেন। যা পরে জৈব সারের উন্নত মাটিতে পরিণত হয়। এই মাটিতে যে চারা রোপণ করা যায় দ্রুত তা বেড়ে ওঠে। বাগানের আঙ্গিনায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তিন কোনায় কিছুটা মাটি খুঁড়ে তার সঙ্গে তিন দিকে ড্রেন করেছেন। গাছগাছালিতে পানির প্রয়োজেন এই ড্রেন কাজ করে। তার গাছগাছালির পরিচর্যায় পূর্ণ সহযোগিতা করেন বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কৃষি কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম। তিনি অল্প জায়গার মধ্যে গাছগুলোকে এমনভাবে রাখেন যাতে সম্প্রসারিত হয়ে বেশি জায়গা না নেয়। গাছ লম্বা হলে শাখা প্রশাখা ছড়াবার আগেই ঘুরিয়ে নিচের দিকে নামিয়ে আনেন। কখনও দুইটি ডাল নামিয়ে বাকল কিছুটা ছেঁটে দিয়ে একত্রিত করে দেন। এতে দেখা যায় অল্প ভূমিতে অনেক গাছ রোপণ করে ফল পাওয়া যায়। এভাবে গাছের চারা তৈরি করেন। কেউ তার কাছে গাছের চারা চাইলে খুশি হয়ে দেন। তবে আশা করেন তার মতো করেই ওই ব্যক্তি চারা লালন করবেন। আরেকজনের উপকার করবেন।

সূত্রঃ দৈনিক জনকণ্ঠ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button

Blocker Detected

Please Remove your browser ads blocker