আন্তর্জাতিক

গুরুর কাছ থেকে শিক্ষা না নেওয়ার পরিণতি

জুমার বিষয়ে একপর্যায়ে মোজাম্বিকের ওপর চাপ প্রয়োগ করে দক্ষিণ আফ্রিকা। ফলে তিনি মোজাম্বিক ছাড়তে বাধ্য হন। চলে যান জাম্বিয়ায়। দায়িত্ব পান এএনসির আন্ডার গ্রাউন্ড ও গোয়েন্দা শাখার। দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এলে ১৯৯০ সালে দেশে ফেরেন জুমা। তাঁর দেশে ফেরা তখনই সম্ভব হয়েছিল, যখন দেশটির সরকার এএনসির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে।

১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ঐতিহাসিক নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনে সব বর্ণের মানুষেরা অংশ নিতে পারে। আর এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতির ‘পরশপাথর’ ম্যান্ডেলা ক্ষমতায় আসেন। নির্বাচন ও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে জুমার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

এএনসির রাজনীতিতে জুমা যেমন সক্রিয় ছিলেন, তেমনি ছিলেন সরকারেও। তিনি ম্যান্ডেলা সরকারের হয়ে কাজ করেন। ম্যান্ডেলা পরবর্তী প্রেসিডেন্ট থাবো এমবেকির ডেপুটি ছিলেন তিনি। এ ছাড়া ১৯৯৭ সালে এএনসির ভাইস প্রেসিডেন্ট হন তিনি। এসব ক্ষেত্রে তিনি ম্যান্ডেলার সমর্থন পান।

ক্ষমতার রাজনীতিতে জুমার যখন উত্থান হয়, তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি ব্যবসায়িক পরিবারের উত্থান ঘটে। এটি ‘গুপ্ত পরিবার’ নামে পরিচিত। পরিবারটির মুখপাত্র হারানাথ ঘোষের দেওয়া তথ্য অনুসারে, দক্ষিণ আফ্রিকায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গুপ্ত পরিবারের তিন সদস্য অজয়, অতুল ও রাজেশ সেখানে যান। কারণ, তাঁদের বাবা শিব কুমার গুপ্তের ধারণা ছিল, দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে উঠবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশ। পরিবারটির সঙ্গে জুমা ও এএনসির ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।

অন্য অনেক রাজনীতিবিদের মতো জুমাও ‘নীতিবাক্য’ ছাড়তেন। যেমন—১৯৯০ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘অস্ত্র ছাড়া যোদ্ধা যেমন, তেমনি পড়াশোনা ছাড়া মানুষ। জীবনে টিকে থাকার যুদ্ধে আপনি শিক্ষা ছাড়া লড়াই করতে পারবেন না। আপনি যদি শিক্ষিত হন, তবেই বাধাবিপত্তি পেরোতে পারবেন।’ কিন্তু জুমার এমন বক্তব্যের সঙ্গে তাঁর কাজের বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়। তাঁর সরকারের সময় দেশটির শিক্ষাব্যবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি। তা ছাড়া তাঁর আমলে শিক্ষা খাত ছিল অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত। যদিও এসব অভিযোগ জুমা বরাবর অস্বীকার করেছেন।

জুমা ছিলেন দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তিনি আত্মজীবনীতে লিখেছেন, তাঁর স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল। তার পরিবর্তে সাত-আট বছর বয়স থেকে তাঁকে খামারে কাজ করতে হতো। বাবা মারা যাওয়ার পর তাঁর মাকে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হয়েছে। সেই জুমা ক্ষমতায় আসার পর সম্পদশালী হয়ে ওঠেন। যার প্রমাণ তাঁর গ্রামের ব্যয়বহুল বাড়ি। এই বাড়ি নির্মাণে তিনি খরচ করেছেন ২ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। এই অর্থ দুর্নীতি থেকে পাওয়া বলে অভিযোগ আছে।

জুমার আমলে অস্ত্র কেনাকাটা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি হয় বলে অভিযোগ ওঠে। নিজের দায় ঢাকতে তিনি একের পর এক মন্ত্রীকে পদচ্যুত করেছেন বলে নিন্দুকেরা বলে থাকেন। তাঁকে পদচ্যুত করতে একাধিকবার অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি কোনো রকমে টিকে গিয়েছিলেন।

জুমা ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ। তবে শেষ পর্যন্ত চাপের মুখে ২০১৮ সালে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি।

বর্ণবাদবিরোধী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একসময়ের সংগ্রামী জুমা এখন এক পুরোপুরি ভিন্ন কারণে কারাবন্দী। দুর্নীতির তদন্তে হাজির না হয়ে আদালত অবমাননার দায়ে এখন তিনি ১৫ মাসের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তাঁর এই কারাবরণকে আইনের শাসনের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি এই বার্তা দিচ্ছে যে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন, এমনকি কোনো সাবেক প্রেসিডেন্টও নন।

জুমার আজকের পরিণতির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন হলো, তিনি তাঁর গুরুর কাছ থেকে শিক্ষা নেননি। উল্টো তিনি তাঁর আমলে দেশকে নানাভাবে পিছিয়ে দিয়েছেন। ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক দর্শনে অটল থাকলে হয়তো আজ তাঁকে গারদে সময় কাটাতে হতো না।

তথ্যসূত্র: এএফপি, রয়টার্স, ব্রিটানিকা ডটকম, এসএ হিস্ট্রি ডট ওআরজি, বিবিসি, জুমা: এ বায়োগ্রাফি এবং বায়োগ্রাফি ডটকম

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Blocker Detected

Please Remove your browser ads blocker