বাংলাদেশ

ঢাকার সর্বত্রই মিলছে এডিস মশা

সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার উদ্যোগে ১০ দিন ধরে পরিচালিত এক সার্ভের ফলাফলে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। পরিস্থিতির মুখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ পরিষ্কারভাবেই বলেছেন, ‘পুরো ঢাকাই এখন ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে। সর্বত্রই মিলছে মশার লার্ভা।’ নতুন এই সার্ভের ফলাফল গতকাল পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা না হলেও ১০০টি স্পটের সব কটিতেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বিভিন্ন স্থাপনায় এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন সার্ভের সঙ্গে যুক্ত গবেষকরা।

এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণের ৬৯টি এলাকায় এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৪১টি এলাকায় সার্ভে পরিচালনা করা হয়। এতে দেখা যায় আগের মতোই রাজধানীর উত্তরা, গুলশান, বনানী, ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, গেণ্ডারিয়া, বনশ্রীর মতো এলাকাগুলোতে বাড়িঘর-অভিজাত স্থাপনায় এডিস মশার লার্ভা বেশি পাওয়া গেছে। তবে দুই সিটির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি পাওয়া গেছে ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে। গত ১৮ জুলাই থেকে গত শনিবার পর্যন্ত এ সার্ভে পরিচালনা করা হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কীটতত্ত্ববিদদের মাধ্যমে।

ওই সূত্র জানায়, ঢাকা উত্তরের ৫৮ শতাংশ এবং ঢাকা দক্ষিণের ৭৮ শতাংশ এলাকায় বেশি মাত্রায় লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আবার নির্মাণাধীন ভবনের অস্থায়ী চৌবাচ্চা, মেঝেতে জমিয়ে রাখা পানি এবং এলাকার দোকান অধ্যুষিত এলাকায় ডাবের খোসা ও গ্যারেজের টায়ারের শতভাগেই লার্ভা মিলেছে। অন্যদিকে বড় মশার ক্ষেত্রে গত মার্চ মাসের চেয়ে এ দফার সার্ভেতে ১০ গুণ বেশি এডিস মশার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে ১৮ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ডিপিএম (ডেঙ্গু) ডা. আক্তারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা শুধু অভিজাত এলাকায় এডিস মশার কথা এত দিন ধরে বললেও এর সঙ্গে বর্জ্যের মধ্যে লার্ভার অস্তিত্ব পেয়েছি। বিশেষ করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অপরিষ্কার বর্জ্যস্তূপে থাকা ডাবের খোসা, টায়ার, বিভিন্ন ধরনের পাত্রের (যার ভেতর পানি জমে থাকতে সক্ষম) ভেতর এডিসের লার্ভা পেয়েছি।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ আমাদের নয়, আমরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে যা যা করণীয় সব কিছু করছি রাত-দিন এক করে। আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা ঘোষণ করা না হলেও সার্বিক ব্যবস্থাপনা চলছে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার আদলেই। আর এর পাশাপাশি আমরা আমাদের কীটতত্ত্ববিদদের মাঠে নামিয়ে মশার প্রজনন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে থাকি। যার ফলাফল ধরে আমরা কোন এলাকায় ডেঙ্গুর পরিস্থিতি কী তা নিরূপণের চেষ্টা করে থাকি এবং সিটি করপোরেশনকেও তথ্য দিয়ে সহায়তা করে থাকি, যাতে তারা সে অনুসারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে পারে।’

উদ্ভূত পরিস্থিতির মুখে গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সার্কুলার জারি করে বলা হয়েছে, প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক ল্যাবে ডেঙ্গুর এনএস-১ পরীক্ষার ফি ৫০০ টাকার ওপরে নেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে আইজিএম ও আইজিজি আলাদাভাবে একটি কিংবা দুটি যুক্তভাবেও ৫০০ টাকার বেশি নেওয়া যাবে না। এর পাশাপাশি সিবিসি পরীক্ষাও সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া যাবে। গতকাল এ সার্কুলার জারির আগে বেসরকারি হাসপাতালের প্রতিনিধিদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পরে মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলাদা বৈঠকে ডেঙ্গুর চিকিৎসার বিষয়ে নানা দিক আলোচনা করা হয়। একই দিনে মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষদের নিয়ে এক বৈঠক করে আগামী ১ আগস্ট সব মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচারণার জন্য মাঠে নামানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ডেঙ্গুর প্রতিষেধকের অনুমোদন দেওয়া এবং এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে আরো ভালোভাবে কাজ করার জন্য ওই ওষুধের প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুর সব পরীক্ষা ফ্রি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল রবিবার বিকেল থেকেই এই নির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্যালইন-ওষুধসহ ডেঙ্গু চিকিৎসায় আনুষঙ্গিক সব কিছু হাসপাতাল থেকে বিনা মূল্যে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ব্যবস্থা করা নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বাবদ ব্যয় বিশেষ খাত থেকে অনুমোদনের সুযোগ দেওয়া আছে বলে তিনি জানান। পাশাপাশি ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনে চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জনবল বৃদ্ধিরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ডেঙ্গু চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ফির নির্দেশনা ও পরীক্ষার মান ঠিকভাবে সংরক্ষণ হচ্ছে কি না তা দেখতে ১০ সদস্যের একটি মনিটরিং টিম মাঠে নামানো হয়েছে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. আয়েশা আক্তারের দেওয়া তথ্য অনুসারে, গতকাল রবিবার ঢাকার ১৫টি বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে ২২৬ জন। অন্যদিকে ৪৫৬ জন ভর্তি হয়েছে ঢাকার আটটি সরকারি হাসপাতালে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা মেডিক্যালে ১৯৬ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৩২ জন, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৬৭ জন, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস হাসপাতালে ২১ জন, মিটফোর্ড হাসপাতালে ৭২ জন উল্লেখযোগ্য। আর ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে গতকাল নতুন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে ১৪১ জন। সব মিলিয়ে গতকাল সারা দেশে মোট সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে ৮২৪ জন। চলতি জুলাই মাসের গত ২৮ দিনে ভর্তি হয়েছে ৯ হাজার ৬১০ জন এবং গত ১ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয় ১১ হাজার ৬৫৪ জন। এর মধ্যে আট হাজার ৭২৫ জন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। বাকি দুই হাজার ৯২১ জন বিভিন্ন হাসপাতালে গতকাল পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ছিল। (যে কয়টি হাসপাতালের তথ্য কন্ট্রোলরুমে আসে সে হিসাব অনুসারে)।

সূত্রঃ কালের কণ্ঠ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Blocker Detected

Please Remove your browser ads blocker