বিনোদন

পৃথিবীর জ্বর আসছে

‘আমাদের মাটি, পানি, বন্য প্রাণী এমনকি মানুষের ওপর প্রভাব কী হবে—গবেষণা না করেই আমরা এই রাসায়নিক পদার্থগুলো ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছি। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের এই বিচক্ষণতার অভাবকে কখনোই ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবে না।’ ১৯৬২ সালে র‌্যাচেল কারসন তাঁর ‘সাইলেন্ট স্প্রিং’ বইয়ে এ কথাগুলো বলেছিলেন। র‌্যাচেলকে নিয়ে লিখেছেন সৈয়দ আশফাকুল হাসান

পরিবেশের সঙ্গে মানুষের খাপ খাওয়ানোর বিষয়ে এক নতুন ধারণা দেয় সাইলেন্ট স্প্রিং। বইটির নাম র‌্যাচেল নিয়েছেন জন কিটসের একটি কবিতা থেকে। নাম মায়াহীন সুন্দরী। নামটি আবার কিটস নিয়েছিলেন পনেরো শতকের একটা ব্যালাড থেকে। কবিতাটিতে হ্রদে পানি নাই, পাখিরা গায় না আর…ধরনের কথা আছে।

একজন র‌্যাচেল    
আমেরিকার পেনসিলভানিয়ায় র‌্যাচেল লুই কারসন জন্মেছিলেন ১৯০৭ সালে। মা-বাবা ইনস্যুরেন্স বিক্রির কাজ করতেন। তাঁদের ছিল ৬৫ একরের একটি খামারবাড়ি। প্রকৃতিবিষয়ক বইপত্র পড়তে খুব পছন্দ করতেন র‌্যাচেল। দশ বছর বয়সেই তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়। কিশোরীবেলাতেই তাঁর একটি উপন্যাসও লেখা হয়ে যায়। কলেজে র‌্যাচেল পড়তে শুরু করেছিলেন ইংরেজি সাহিত্য কিন্তু পরের দিকে জীববিজ্ঞানকে বিষয় করেন। জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি জিনতত্ত্ব নিয়েও পড়াশোনা করেছেন। র‌্যাচেল ইঁদুর, সাপ ও বেজি নিয়ে গবেষণা করেন। প্রাণিবিজ্ঞানে তিনি স্নাতকোত্তর হন ১৯৩২ সালে। ১৯৩৫ সালে বাবা মারা গেলে পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়। র‌্যাচেল মার্কিন মৎস্য ব্যুরোতে চাকরি নেন। একই সঙ্গে রেডিওর জন্য জলের প্রাণী নিয়ে লিখতেন। বাল্টিমোর সান এবং অন্য পত্রিকায়ও লিখতে থাকেন। ১৯৩৭ সালে দি আটলান্টিক মান্থলির জন্য তিনি দ্য ওয়ার্ল্ড অব ওয়াটারস লেখেন। প্রকাশনী সংস্থা সাইমন অ্যান্ড সুশটারের রচনাটি পছন্দ হয়। আরেকটু যোগ করে পরে ১৯৪১ সালে ‘আন্ডার দ্য সি উইন্ড’ নামে সেটি বই আকারে প্রকাশিত হয়।

ডিডিটির (ডাইক্লোরোডাইফিনাইলট্রাইক্লোরোইথেন) সঙ্গে র‌্যাচেল প্রথম পরিচয় হয় ১৯৪৫ সালে। তখন হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে বোমা ফেলে আমেরিকা বগল বাজাচ্ছে। ডিডিটিকে বলা হচ্ছিল বোমা কীটনাশক। পরিচিত হওয়ার পর থেকে র‌্যাচেল আর ডিডিটির পিছু ছাড়েননি। জীববিজ্ঞানী ও পরিবেশ সংরক্ষক র‌্যাচেল কিন্তু ১৯৫০ সাল থেকেই পেশাদার লেখক হয়ে যান। ১৯৫১ সালে তাঁর ‘দ্য সি অ্যারাউন্ড আস’ জনপ্রিয় হয়। ৮৬ সপ্তাহ ধরে নিউ ইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলার তালিকায়ও ছিল।

এবার সাইলেন্ট স্প্রিং     
পরিবেশের ওপর কীটনাশকের প্রভাব নিয়ে এ বই নীরব বসন্ত। পাঁচের দশকের মাঝামাঝি সময়ে র‌্যাচেল বইটি লেখার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীকে সহায়তা দিতে জীববিজ্ঞানী, রসায়নবিদ, পদার্থবিদ প্রমুখকে একত্র করা হয়েছিল। যুদ্ধের পরে তাঁদের উদ্ভাবিত যুদ্ধসামগ্রীগুলোকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়। ডিডিটিও ছিল তেমন একটি উদ্ভাবন। টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া এবং পোকামাকড় থেকে সংক্রমিত অন্য কিছু রোগের বিস্তার রোধে কার্যকর ছিল। যুদ্ধের পরে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ ও করপোরেশনগুলো ডিডিটি এবং অন্যান্য শক্তিশালী রাসায়নিককে গৃহস্থালি উপকরণ করে তোলার প্রচারণা চালাতে থাকে। বলে, এর মাধ্যমে উৎপাদন বাড়বে এবং রোগ কমবে। কীটনাশক ছড়ানো হয় প্লেন থেকেও। ওয়ালপেপার পর্যন্ত তৈরি হয় ওই সব রাসায়নিক দিয়ে। ১৯৪৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ডিডিটির উৎপাদন ছিল ৪,৩৬৬ টন। ১৯৬৩ সালে এটা দাঁড়ায় ৮১,১৫৪ টনে। কারসন মানুষ এবং পরিবেশের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। বলা যায় উদ্বিগ্ন হন। তিনি কীটনাশকের কেবল উপকারিতা নয়, এর চারিত্রিক গুণাগুণ যাচাই করতে থাকেন। বইটি লিখতে গিয়ে তিনি কয়েক ডজন বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন। শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার নেন। তিনি বলতে থাকেন, খেয়াল করে দ্যাখো কীটের সঙ্গে পাখিগুলোও মরে পড়ে আছে। বোঝা গেল, ডিডিটির রাসায়নিক গুণাগুণ পরিবেশেই শুধু নয়, খাদ্যশৃঙ্খলেও অবস্থান করছে। এর কিছু উপাদান (যেগুলো গলে যায় না) চর্বির টিস্যুতে জমা হয় এবং চিকিৎসাজনিত সমস্যা তৈরি করে। পরের প্রজন্মেও স্থানান্তরিত হয়। র‌্যাচেল মানুষকে জানান, মানুষ ও প্রকৃতি পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত এবং একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। ১৯৬২ সালের শরতে প্রকাশিত হয়েছিল নীরব বসন্ত। তখন আলোচনা যেমন হয়েছিল সমালোচনাও হয়েছিল অনেক। তবে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি বইটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন। ১৯৬৩ সালে প্রেসিডেন্টের বিজ্ঞান উপদেষ্টা কমিটি কীটনাশকের সীমিত ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে এবং স্বাস্থ্যের ওপর এর ঝুঁকি নিয়ে গবেষণার আহ্বান জানান। সাইলেন্ট স্প্রিং ষাটের দশকে শুরু হওয়া এবং সত্তরের দশকে তুঙ্গে ওঠা পরিবেশ আন্দোলনকেও প্রভাবিত করে। সে পথ ধরেই পরিবেশ সংরক্ষণ এজেন্সি প্রতিষ্ঠা এবং পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্য রক্ষাকারী অনেক আইন পাস হয় মার্কিন মুল্লুকে। পরিবেশবান্ধব রসায়নবিদ্যা চালু করতেও ভূমিকা রেখেছে বইটি।

২০০৭ সালে এসে কেমিক্যাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নিউজের প্রধান সম্পাদক রুডি এম বম একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘একসময় যখন মানুষ নিজেকে প্রকৃতি থেকে আলাদা বলে বিশ্বাস করেছিল এবং এটিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টায় রত ছিল, তখন কারসন আবেগপূর্ণভাবে যুক্তি দিয়েছিলেন যে প্রকৃতি প্রকৃতপক্ষে আন্তঃসংযোগ এবং আন্ত নির্ভরতার একটি শৃঙ্খল আর মানুষ তার একটি অংশ আর একে হুমকির মুখে ফেলা তাদের নিজেদের জন্যই বিপজ্জনক।

আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি ২০১২ সালের ২৬ অক্টোবর জাতীয় ঐতিহাসিক রাসায়নিক মাইলফলক হিসেবে সাইলেন্ট স্প্রিংকে মনোনীত করে। ১৯৬৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন র‌্যাচেল।

সূত্রঃ কালের কণ্ঠ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button

Blocker Detected

Please Remove your browser ads blocker