বাংলাদেশ

জলবায়ুর ক্ষতি পোষাতে পারছে না বাংলাদেশের মতো দেশ

অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানির চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে এ মুহূর্তে ১০ শতাংশ মানুষ পানির সংকটের মধ্যে আছে। ২০৫০ সাল নাগাদ তা বেড়ে ২৫ শতাংশ হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উজান থেকে আসা গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বন্যার ভয়াবহতা বাড়তে পারে।

এ ব্যাপারে আইপিসিসির সাবেক সদস্য ও বাংলাদেশ পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ নিজের সামর্থ্য দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু তা যে যথেষ্ট নয়, পরিস্থিতি যে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে, তা বুঝে বাংলাদেশকে জলবায়ুবিষয়ক নীতি ও পরিকল্পনা নিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আন্তর্জাতিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, বাজারব্যবস্থা, আর্থিক খাত এবং বাণিজ্যিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যার কারণে বাংলাদেশ পণ্যের সহজলভ্যতা কমবে এবং দাম বাড়বে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাজারেও ধস নামতে পারে। কৃষি উৎপাদনে ধস, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বিপর্যয় এবং পণ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সামগ্রিকভাবে আর্থিক অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

আইপিসিসির বিজ্ঞানী দলের অন্যতম সমন্বয়কারী ও প্রধান লেখক রওশন আরা বেগম বলেন, ‘এ প্রতিবেদন থেকে এটি স্পষ্ট যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে পৃথিবীর অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশকে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অভিযোজন খাতে আরও বেশি অর্থ বরাদ্দ করা উচিত।’

প্রতিবেদনে ২০২০ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের উদাহরণ টেনে বলা হয়, এটি ছিল গত ১০০ বছরের মধ্যে এই অঞ্চলে আঘাত হানা সবচেয়ে মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় বা সুপার সাইক্লোন। ঝড়টির সঙ্গে আসা বৃষ্টিতে জলোচ্ছ্বাস, পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এই ঝড়ে বাংলাদেশ ও ভারতে ১৩৫ কোটি ডলারের সম্পদের ক্ষতি হয়। মারা যায় প্রায় ১০০ মানুষ ও ঝড়ের কারণে দুই দেশে ২৪ লাখ করে মানুষকে বাস্তুচ্যুত হতে হয়।

আইপিসিসির প্রতিবেদনে বিশ্বের ক্ষুদ্র দ্বীপ এবং উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর বিপন্নতার উদাহরণ দিতে গিয়ে বাংলাদেশকে সামনে আনা হয়েছে। বাংলাদেশে ২০০৯ সালে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় আইলার প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে, ওই ঝড়ের আগে বাংলাদেশে সবচেয়ে ক্ষতিকর ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হেনেছিল ১৯৭০ সালে। ওই ঝড়ে প্রায় ৫ লাখ মানুষ মারা যায়। ঘূর্ণিঝড় আইলায় বাতাসের গতি ছিল ১২০ কিলোমিটার ও সাড়ে ছয় মিটার উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস উপকূলে আছড়ে পড়ে। এতে ১১টি উপকূলীয় জেলায় ৩৯ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মারা যায় ১৯০ জন ও ৭ হাজার ১০০ জন আহত হয়। তবে ঘূর্ণিঝড়ের আগে আগাম পূর্বাভাস দেওয়া এবং আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে উপকূলবাসীদের নিয়ে যাওয়ায় অনেক মানুষ রক্ষা পেয়েছে।

বাংলাদেশ উপকূলে একের পর এক ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের আঘাতে সেখানকার বাসিন্দারা অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এই তথ্য তুলে ধরা প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার পর খুলনার দাকোপ ও কয়রা উপজেলার মানুষ স্থায়ীভাবে তাদের এলাকা ছাড়ছে। অন্যত্র গিয়ে তারা আগের জীবিকা এবং জীবনমানে ফিরে যেতে পারছে না। আরেকটি উদাহরণ হিসেবে ঢাকায় ভোলা বস্তির উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে, সেখানে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা বসতি গড়ে তুলেছে। বাস্তুচ্যুত এসব মানুষের স্থায়ী জীবিকা না থাকায় এবং জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় তারা মানসিক চাপ ও অস্থিরতার মধ্যে থাকছে।

সুন্দরবনে ক্ষতি বাড়ছে

প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার মানুষেরা খাপ খাওয়াতে না পেরে সুন্দরবনে নানা ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। যেমন জীবিকা হারিয়ে অনেকে সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী নদ-নদীগুলোতে অবৈধ সূক্ষ্ম জাল দিয়ে মাছের পোনা ধরছে। অনেকে সুন্দরবনের গাছ কেটে বিক্রি করছে। দরিদ্র ও বিপন্ন এসব মানুষকে থামানোর জন্য আইন প্রয়োগ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় কৃষিকাজ বাদ দিয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছে।

আইলা ও সিডরের পর উপকূলীয় ক্ষতিগ্রস্ত বিশাল জনগোষ্ঠী তাদের বাড়িঘর মেরামত এবং পুনর্নির্মাণের জন্য সুন্দরবন থেকে কাঠ সংগ্রহ করছে। এর ফলে সুন্দরবনের বৃক্ষসম্পদের ওপরে চাপ বেড়েছে। বনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য টেকসই বাঁধ, ঘূর্ণিঝড় সহনশীল ঘরবাড়ি নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক সামর্থ্যের অভাব বাংলাদেশের রয়েছে।

সেন্ট মার্টিনের বিপদের চিত্র ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ এই দ্বীপ থেকে বছরে জাতীয় অর্থনীতিতে ৩ কোটি ৩৬ লাখ মার্কিন ডলার যোগ হয়। মূলত পর্যটন ও অন্যান্য খাতে এই আয় হুমকিতে পড়তে পারে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন অন্যদিকে মানুষের নানা তৎপরতায় ওই দ্বীপটির অস্তিত্ব বিপন্ন হতে চলেছে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বড় অংশ উপকূলীয় এলাকায় হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় পানি পরিশোধন করা কঠিন হয়ে যাবে। এর ফলে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র পানির সংকটে পড়বে। আর এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র অন্যত্র সরাতে হবে।

২০১৬ সালের হঠাৎ বন্যায় বাংলাদেশের হাওর এলাকায় ২ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়। ৮ লাখ ৫০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই দুর্যোগের কয়েক মাসের মাথায় বাংলাদেশে চালের দাম ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়।

এ ব্যাপারে প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থা আইইউসিএন, বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশের কয়রার মতো প্রান্তিক এলাকার সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপদে। তা এই প্রতিবেদন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। কিন্তু গত বছরের গ্লাসগোর জলবায়ু সম্মেলনে এসব জনগোষ্ঠীর ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। বাংলাদেশের উচিত আগামী সম্মেলনকে সামনে রেখে বৈশ্বিক পরিসরে বিজ্ঞানীদের এই আশঙ্কাগুলোকে আরও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরা।’

সূত্রঃ প্রথম আলো

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button

Blocker Detected

Please Remove your browser ads blocker