বাংলাদেশরাজনীতি

সিপিবি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ আর নেই

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক জননেতা কমরেড সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ ২৮ মে মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন।

তিনি নিউমোনিয়া, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা এবং হৃদরোগে ভুগছিলেন। তিনি সর্বশেষ বিরল স্টিভেন-জনসন সিনড্রোমে আক্রান্ত হন। তাঁকে গত ২০ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ২৭ মে তাঁকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন।

সৈয়দ আবু জাফর আহমেদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ শাহ আলম।

এক বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশের রাজনীতিতে যখন সৈয়দ আবু জাফর আহমেদের মত প্রজ্ঞাবান ও আদর্শনিষ্ঠ নেতার খুব প্রয়োজন ঠিক এমন সময়ে তার প্রস্থান জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

তারা বলেন, এদেশের গণমানুষের অধিকার আদায় এবং শোষণমুক্তির সংগ্রামে তার অসামান্য ভূমিকা চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন।

আজ ২৯ মে ২০১৯, বুধবার সকাল ১০টায় কমরেড সৈয়দ আবু জাফর আহমেদের মরদেহ সিপিবি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয় মুক্তিভবনে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাখা হবে।

কমরেড সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক।
সিলেটের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কৃতি ব্যক্তিত্বদের মধ্যে সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ অন্যতম। তিনি ১৯৫৪ সালের ১১ জুলাই মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সৈয়দ মনোয়ার আলী এবং মা সৈয়দা আমিরুন্নেসা খাতুন।
সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ দর্শনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে উচ্চতর পড়াশোনার জন্য তিনি ১৯৭৯ সালে জার্মানি যান।

ছাত্রজীবন থেকেই প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। ছাত্র রাজনীতির পাশাপাশি সিলেটের বিভিন্ন পেশাজীবি-সামাজিক-সাংস্কৃতিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন। ১৯৭০ সালে তিনি মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক, মৌলভীবাজার জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং পরবর্তীতে উভয় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

সিলেটে চা শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১৯৭২ সালে তিনি প্রথম কারাবরণ করেন। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার অব্যবহিত পরই আবার ১৯৭৩ সালের ফেব্রæয়ারিতে তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করায় ফের তিনি গ্রেপ্তার হন এবং বিনাবিচারে দীর্ঘ ১ বছর জেলজীবন কাটান। এছাড়া এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও তিনি ছিলেন সমান সক্রিয়। গণতন্ত্রের ওই উত্তাল আন্দোলন-সংগ্রামে তার সোচ্চার ভূমিকার জন্য তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার-নির্যাতনের শিকার হন।

তিনি বিভিন্ন পেশাজীবী আন্দোলনেও শুরু থেকেই সোচ্চার ছিলেন। ক্ষেতমজুর আন্দোলনে তার অগ্রণী ভূমিকার কারণে ক্ষেতমজুর সমিতির সাংগঠনিক রাজনীতির শুরুর দিকেই তিনি সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। প্রগতিশীল রাজনীতির পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনেও তার ছিল সমান বিচরণ। ছাত্রজীবন থেকেই সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৯০ সাল থেকে মৌলভীবাজারের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক মনুবার্তার সম্পাদক-প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পত্রিকাটির প্রকাশনা সম্প্রতি বন্ধ হয়ে গেছে। গণমানুষের মুক্তি ও চেতনাগত পরিবর্তনে তিনি সশরীরে রাজপথে যেমন সক্রিয়, তেমনই সক্রিয় তার কলম। বৃত্তবন্দি অপরাজনীতির ধারাভাষ্যসহ আর্থ-সামাজিক ইস্যুতে আমৃত্যু তার কলম সচল ছিল।

তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র দশম ও একাদশ কংগ্রেসে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ ২৮ মে ২০১৯ দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button

Blocker Detected

Please Remove your browser ads blocker