অপরাধবাংলাদেশ

করের কোটি টাকা আত্মসাৎ

জনগণের দেওয়া আয়করের টাকা আত্মসাৎ করেছেন সোনালী ব্যাংক ও কর কর্মকর্তারা। ছয় বছর ধরে দিনাজপুর ও পঞ্চগড়ের মানুষের দেওয়া আয়করের পে-অর্ডারের টাকা সরকারের ব্যাংক হিসাবে জমা না করে কর অফিসের হিসাবে জমা করার পর তা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করছিলেন তারা। প্রাথমিকভাবে ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে, টাকার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ঘটনায় রংপুর কর অঞ্চলের ১৬ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অজ্ঞাতনামা ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পঞ্চগড় ও দিনাজপুরে তিনটি মামলা করেছেন রংপুর কর অঞ্চলের সার্কেল-২০-এর সহকারী কর কমিশনার আফরোজা বেগম। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দিনাজপুর সমন্বিত কার্যালয় অর্থ আত্মসাতের সত্যতা পেয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার অভিযান চালিয়ে কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড় ও নীলফামারী থেকে চার আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে দুদক।

করের টাকা আত্মসাৎ হওয়ার ঘটনার কথা স্বীকার করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সংস্থাটি। দেশের অন্য কর অঞ্চলগুলোতেও একইভাবে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা শুরু করেছে এনবিআর। রংপুর কর অঞ্চলের সার্কেল-২০-এর সহকারী কর কমিশনার আফরোজা বেগম বলেন, এ ঘটনার পর এনবিআর সারা দেশে তদন্ত শুরু করেছে।

এ বিষয়ে এনবিআরের সদস্য (কর প্রশাসন ও মানবসম্পদ) কালিপদ হালদার গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দিনাজপুর ও পঞ্চগড়ে করের টাকা সরকারের হিসাবে জমা না করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আত্মসাৎ করেছে। এত বড় অন্যায় মানা যায় না। অভিযুক্তদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, করের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তারাও সম্পৃক্ত রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সোনালী ব্যাংককে জানানো হয়নি। আগে নিজেদের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর সোনালী ব্যাংককেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ গতকাল টেলিফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি সৌদি আরবের মদিনায় রয়েছি ওমরাহ করার জন্য। এ বিষয়ে এখন কোনো কিছু বলা সম্ভব নয়।

পঞ্চগড়ে মামলার তথ্য থেকে জানা যায়, দিনাজপুর কর অঞ্চলের আয়কর বাবদ জনগণের দেওয়া পে-অর্ডার নিয়ম অনুযায়ী সরকারি কোষাগারের নির্ধারিত কোডে (১-১১৪১-০০৬৫-০১১১) সোনালী ব্যাংকের পঞ্চগড় শাখায় জমা করার কথা। সোনালী ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যোগসাজশ করে ২০১২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে গত ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করের ১ কোটি ৬৪ লাখ ৬৯ হাজার ৭৯১ টাকার পে-অর্ডার সরকারের হিসাবে জমা না করে পঞ্চগড় কর কার্যালয়ের চলতি হিসাবে (০০১০১৯৯৯৪) জমা করেন। পরে ব্যাংক ও কর কর্মকর্তারা চেক জালিয়াতির মাধ্যমে ওই টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন।

দিনাজপুরেও আয়করদাতাদের করের অর্থ সরকারি কোষাগারের নির্ধারিত কোডে (১-১১৪১-০০৬৫-০১১১) সোনালী ব্যাংকের দিনাজপুর করপোরেট শাখায় জমা করার কথা। ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে পে-অর্ডারগুলো দিনাজপুর কর অঞ্চল সার্কেল-৮ ও সার্কেল-৯-এর কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ সংক্রান্ত চলতি হিসাবে (১৮০৯৩৩৩০০১৯৬৪, ১৮০৯৯৯৯০০৫২৫৫ ও ১৮০৯৩৩৩০০৪৩৬৪) জমা করেন। এরপর চেক জালিয়াতির মাধ্যমে পুরো টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করেন ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর কর্মচারীরা।

টাকা আত্মসাতের ঘটনায় গত ১৬ মে পঞ্চগড়ে মামলা করেন সার্কেল-২০-এর সহকারী কর কমিশনার আফরোজা বেগম। এতে রংপুর কর অঞ্চলের সার্কেল-১৮-এর কম্পিউটার অপারেটর মো. ওবায়দুর রহমান, সার্কেল-১৪-এর উচ্চমান সহকারী মো. রফিকুল ইসলাম, সার্কেল-১৬-এর অফিস সহকারী মো. মাসুদ রানা, সার্কেল-৪-এর উচ্চমান সহকারী মো. ফিরোজ জামান, সার্কেল-২০-এর অফিস সহকারী মো. জালাল উদ্দিন, নিরাপত্তা প্রহরী রাজেকুল ইসলাম, ঝাড়–দার আবদুস সাত্তার এবং ২০১২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের পঞ্চগড় শাখায় কর্মরত কর্মকর্তা-কার্মচারীদের আসামি করা হয়েছে।

দিনাজপুরে মামলা করেছেন সার্কেল-৮-এর সহকারী কর কমিশনার নাজনীন আকতার নিপা। তিনি মামলায় উল্লেখ করেন, গত ২৫ এপ্রিল কিছু ঘষামাজা করা পে-অর্ডার ব্যাংকে জমা দিতে যায় আয়কর বিভাগের লোক। বিষয়টি জানতে পেরে তৎক্ষণাৎ সেগুলো জব্দ করে তা ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। এরপর জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের বিষয়টি ধরা পড়ে। গত ২০ মে নাজনীন আকতার নিপা বাদী হয়ে দিনাজপুর কোতোয়ালি থানায় দুটি মামলা করেছেন। দুটি মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ৩৩ লাখ ৯৪ হাজার ৪২২ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।

দিনাজপুরে মামলায় আসামি করা হয়েছে রংপুর কর অঞ্চলের সার্কেল-৮-এর প্রধান সহকারী আবদুল মজিদ, কম্পিউটার অপারেটর মো. ওবায়দুর রহমান, একজন আয়কর উকিলের সহকারী আশিক ওরফে আতিক, সোনালী ব্যাংক দিনাজপুর শাখার কর্মকর্তা (ক্যাশ) মো. হাবিব, রংপুর কর অঞ্চল-৯-এর অস্থায়ী অফিস সহকারী নিরেন চন্দ্র রায় ও আপেল, সার্কেল-৯-এর উচ্চমান সহকারী মো. জাহেদ উদ্দিন, মো. রফিকুল ইসলাম, অফিস সহায়ক মো. মোকাররম হোসেনকে। মামলায় এদের বাইরে আরও ৮-১০ জন অজ্ঞাত আসামির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই সোনালী ব্যাংকের দিনাজপুর করপোরেট শাখার কর্মকর্তা।

মামলায় ১ কোটি ৬৪ লাখ ৬৯ হাজার ৭৯১ টাকা আত্মসাতের কথা উল্লেখ করা হলেও এর পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঠিক কী পরিমাণ অর্থ জালিয়াতি হয়েছে তা জানতে সোনালী ব্যাংকের দিনাজপুর করপোরেট শাখা ও পঞ্চগড় শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে মৌখিক এবং লিখিতভাবে তথ্য ও সহযোগিতা চেয়েছিলেন দুই জেলার আয়কর কর্মকর্তারা। তা সত্ত্বেও ব্যাংকের কর্মকর্তারা কোনো ধরনের সহযোগিতা করেনি বলে অভিযোগ করেছেন কর কর্মকর্তা নাজনীন আকতার নিপা ও আফরোজা বেগম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের পঞ্চগড় শাখার জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক একেএম মতিয়ার বলেন, করের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ব্যাংক তদন্ত কমিটি করেছে। মামলা হওয়ায় বিচারাধীন বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

কর কর্মকর্তাদের সহযোগিতা না করার অভিযোগ বিষয়ে তিনি বলেন, কর কার্যালয় থেকে যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। তাদের কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা না পাওয়ায় সহায়তা করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে এ ঘটনায় দুদকের একটি দল অভিযান চালিয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কুড়িগ্রাম উপ-কর কমিশনার কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন দুদক দিনাজপুর সার্কেলের সহকারী পরিদর্শক ওবায়দুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, মঙ্গলবার কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড় ও নীলফামারী থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে।

কুড়িগ্রাম সদর থানার ওসি মাহফুজার রহমান গ্রেপ্তারের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, দুদকের অভিযানে পুলিশ সহায়তা করেছে।

সূত্রঃ দেশ রূপান্তর

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button

Blocker Detected

Please Remove your browser ads blocker